মোঃ রায়হান হোসেন: আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখতে মহানগর পুলিশের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। ছিনতাই, দস্যুতা এবং সশস্ত্র হামলার ঘটনায় যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, তখন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ‘সবকিছু স্বাভাবিক’ এবং ‘সিলেট লন্ডনের চেয়েও নিরাপদ’ এমন আজগুবি দাবি নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং বদলি ঠেকাতে পুলিশ কমিশনার মাঠপর্যায়ের অপরাধের তথ্য গোপন ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এক অশুভ খেলায় মেতেছেন।
এদিকে, আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর রহস্যজনক নির্লিপ্ততা ও তথ্য গোপনের অপচেষ্টায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক দুর্ধর্ষ ছিনতাই ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও কমিশনারের পক্ষ থেকে বারবার তা অস্বীকার কিংবা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপপ্রয়াস এবং বিতর্কিত ‘গণবিজ্ঞপ্তি’ জারির পর পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও কমিশনার দাবি করছেন, সিলেট এখন ‘লন্ডনের চেয়েও নিরাপদ’। এমন উক্তিকে সিলেটবাসীর সঙ্গে কমিশনারের ‘নিষ্ঠুর রসিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীরা।
তথ্য গোপনের ‘তুঘলকি’ মহোৎসব ও তীব্র প্রতিবাদ: অভিযোগ উঠেছে, বদলির আতঙ্ক কিংবা ব্যর্থতা ঢাকতে পুলিশ কমিশনার সিলেটে সংঘটিত বড় বড় অপরাধের ঘটনাগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে ধামাচাপা দিচ্ছেন। তদন্তের আগেই তিনি ঘটনার ফলাফল ঘোষণা করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। গত ৫ এপ্রিল সিলেট জেলা প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ কমিশনারের এই ‘অদ্ভুত’ লুকোচুরি কাণ্ডে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। এছাড়াও গত ৭ এপ্রিল সিলেট নগরীর টিলাগড়ে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, পুলিশ কমিশনার অপরাধ দমনের চেয়ে অপরাধ আড়ালে বেশি সচেষ্ট। এমনকি সাংবাদিকদের ওপর হওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ‘মিথ্যা গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়ে তিনি পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীদের চরমভাবে অপমান করেছেন।
৫০ লক্ষ টাকা ছিনতাই, মুখ থুবড়ে পড়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা: সিলেটে ‘ছিনতাই নেই’—পুলিশ কমিশনারের এমন দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গতকাল শুক্রবার (৮ মে) প্রকাশ্য দিবালোকে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিকাশ ডিস্ট্রিবিউটর নাসিম হোসাইনের ৫০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মোগলাবাজার থানাধীন পারাইরচক এলাকায় প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে অস্ত্রের মুখে এই বিপুল অর্থ লুট করা হয়। অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ মনজুরুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা অপরাধী শনাক্তের খবর পাওয়া যায়নি।
সন্তানের গলায় ছুরি ধরে মায়ের অলঙ্কার লুট: আইনশৃঙ্খলার কঙ্কালসার অবস্থা প্রকট হয়েছে গত ৬ মে দক্ষিণ সুরমার চান্দাই এলাকায়। এক ইমামের স্ত্রী তার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা শিশুর গলায় ছুরি ধরে জিম্মি করে মায়ের শরীর থেকে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পৈশাচিক ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লেও তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ বারবার ‘তদন্ত চলছে’ বলে দায় এড়াচ্ছে।
ব্যর্থতার অন্তরালে গগনচুম্বী দুর্নীতির অভিযোগ: পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে তিনি মূলত নিজের অপকর্ম ঢাকতে চেয়েছিলেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। যদিও তীব্র আন্দোলনের মুখে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে বিতর্কিত সেই ফরমান প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তিনি।
পুলিশ কমিশনারের এই রহস্যজনক নীরবতা ও অপরাধীদের সাথে কথিত ‘সখ্যতা’ নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন- যদি তথ্য-প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ নাগরিকরাই সংগ্রহ করে দেয়, তবে প্রশাসনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের কাজ কী? সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ভেতরে এখন চলছে পদায়ন ও প্রভাব বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। জননিরাপত্তার পরিবর্তে নিজের চেয়ার টিকিয়ে রাখা এবং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত কর্মকর্তাদের কারণে আধ্যাত্মিক এই নগরী এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে সিলেটের আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত পতন অনিবার্য বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। সিলেট নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে অবিলম্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
Leave a Reply